আইন কি? What Is The Law?
আইন বলতে সমাজ স্বীকৃত এবং রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নিয়ম-কানুনকে বোঝায় যা মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- আইন বিজ্ঞানী জন অষ্টিন (John Austin) -এর মতে, Law is the Command of the sovereign. অর্থাৎ, সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের আদেশই আইন।
- অধ্যপক হল্যাণ্ড (Prof. Holland) -এর মতে – Law is a general rule of external human action enforced by a sovereign political authority.) অর্থাৎ, আইন হলো মানুষের বাহ্যিক আচরণের নিয়ন্ত্রনবিধি যা সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বলবৎ করা হয়।
- আইনবিদ অধ্যাপক স্যামন্ড (Prof. Salmond) -এর মতে – Law is the body of principles recognised and applied by the state in the administration of justice.) অর্থাৎ, আইন হল ন্যায় প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রয়োগকৃত নীতিমালা।
মানুষ আইন মান্য করে কেন? Why do people obey the law?
শাস্তির ভয়,আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা,সম্মানহানি এই তিনটি কারণে মানুষ আইন মান্য করে।
মানুষ শাস্তি পাওয়ার ভয়ে আইন মান্য করে। আইন ভঙ্গ করলে তার অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইন তাকে শাস্তি দেবে, সে ভয়ে মানুষ আইন মান্য করে।
একজন দেশপ্রেমিক তার দেশের প্রতি থাকে নিখুঁত ভালোবাসা। তারা দেশের নিয়ম-কানুনের প্রতি থাকে শ্রদ্ধাশীল। তারা সমাজ বা দেশের অমঙ্গলজনক কোনো কাজ করে না। ফলে, আইনি শাস্তির বেড়াজাল তাদের কখনো সম্পর্শ করে না। কোন অপরাধের কতটুকু শাস্তি এগুলো নিয়ে তারা কখনো ভাবে না।
সম্মানহানির ভয়েও মানুষ আইন অমান্য করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না। আইন অমান্য করলে, অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তি পেতে জেলে যেতে হবে। যা সমাজের চোখে নেতিবাচক।
আইনের বৈশিষ্ট্যসমূহ characteristics of law :
নিচে আইনের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি: আইনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রথা, রীতি-নীতি ও নিয়ম-কানুনের সমষ্টি।
রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও স্বীকৃতি: আইনের আর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিধি-বিধান প্রচলিত নিয়ম-কানুন বা প্রথাসমূহ যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদন ও স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। আইন হতে হলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রচিত, অনুমোদিত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হতে হবে।
- সার্বজনীনতা: আইন সার্বজনীন। সকল মানুষই আইনের দৃষ্টিতে সমান। জাতি-ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সকল মানুষের উপর আইন সমভাবে প্রযোজ্য।
- সুস্পষ্ট: আইনের বিধানগুলো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট। সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইন বলবৎ হয়। এ জন্যই আইনের ক্ষেত্রে কোন অস্পষ্টতা থাকে না।
- আইন ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য: কেউ আইন ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হয়। আইনের ব্যতিক্রম সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিধায় আইন অবশ্যই পালনীয়। তাই আইন ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
- আইনের স্থান সবার ঊর্ধ্বে: আইন হচ্ছে সার্বভৌম শক্তির আদেশ। তাই সকলেই আইন মেনে চলতেবাধ্য। সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক সমর্থিত বিধায় আইনের স্থান সবার ঊর্ধ্বে।
- বাহ্যিক আচার আচরণের সাথে যুক্ত: আইন প্রধানত মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ ও ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের চিন্তা ভাবনার সাথে আইনের প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নেই।
আইনের উৎসসমূহ Sources of law :
আইন বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যাপক হল্যান্ডের মতে আইনের উৎস ৬ টি। আইনের উৎসসমূহ নিম্নরূপ:
- প্রথা বা রীতিনীতি
- ধর্ম
- বিচারকের রায়
- ন্যায়বিচার
- বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা
- আইনসভা
নিম্নে আইনের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. প্রথা বা রীতিনীতি
প্রথা হ আইনের এক সুপ্রাচীন উৎস। প্রত্যেক সমাজেই সুপ্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন প্রকার প্রথা ও রীতিনীতি প্রচলিত। এ সমস্ত প্রথা ও রীতিনীতি সমাজ জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণের দিকে দৃষ্টি দিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ যখন এগুলোরপ্রতি সমর্থন জানায় তখন এ সব প্রথা ও রীতিনীতি আইনে পরিণত হয়। অতএব এভাবেই সমাজ জীবনে প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতি আইনের উৎস রূপে গণ্য হয়।
২. ধর্ম
আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ধর্ম। বিশ্বে প্রচলিত প্রত্যেক ধর্মের অনুশাসন মর্যাদা সহকারে পালিত হয়ে থাকে। ধর্মীয় এ সমস্ত অনুশাসনের যেগুলো সমাজ জীবনকে বিকশিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে থাকে সেগুলো পরবর্তিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের স্বীকৃতি পেয়ে আইনের মর্যাদা লাভ করে। মুসলিম, খ্রিষ্টীয় ও হিন্দু আইন এর উপযুক্ত উদাহরণ।
৩. বিচারকের রায়
বিচারকগণ অনেক সময় নিজেদের বিবেক ও অভিজ্ঞতা থেকে নতুন আইন সৃষ্টি, প্রচলিত আইনের ব্যাখ্যা বা যথার্থতা বিশ্লেষণ করেন। ফলে আইনের নতুন নতুন সূত্র সৃষ্টি হয়। অন্যান্য বিচারক পরবর্তী সময়ে আইনের এসব নতুন সূত্রকে বিচারের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন।
৪. ন্যায়বিচার
যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রচলিত আইন যখন অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে কিংবা নতুন সমস্যারসমাধান পচ্র লিত আইনের মধ্যে না পাওয়া যায়, তখন বিচারকগণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের বিচারবুদ্ধি ও ন্যায়বোধ প্রয়োগ করেন। এভাবে নতুন আইন সৃষ্টি হয় এবং আইন যুগোপযোগী হয়।
৫. বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা
যুগে যুগে আইনজ্ঞদের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা, ব্যাখ্যা ও মতামত বিচারালয়কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। এতে আইনের প্রকৃত অর্থের প্রকাশ ঘটে। ফলে আইনজ্ঞদের এসব আলোচনা ও সিদ্ধান্ত আইনের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬. আইনসভা
আধুনিক রাষ্ট্রে আইনসভাই হচ্ছে আইনের প্রধানতম উৎস। আইনসভা সমাজের প্রয়োজনের সাথে সংগতি রেখে নতুন নতুন আইন তৈরি করে, আইনের রদবদল ও সংশোধন করে থাকে। আইনসভাই হচ্ছে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক পরিষদ। তাই আইনসভা জনমতের সাথে সঙ্গতি রেখে আইন প্রণয়ন করে থাকে। সুতরাং আইনসভাই হচ্ছে আইন প্রণয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এই ছয়টি উৎস ছাড়াও কেউ কেউ জনমতকে আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অপেনহেম বলেন, ‘জনমত আইনের অন্যতম উৎস’। জনমতের প্রভাবে সরকার অনেক আইন তৈরি করে।
আইনের প্রকারভেদ Types of law :
প্রাথমিকভাবে আইনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন; সরকারি আইন, বেসরকারি আইন, এবং আন্তর্জাতিক আইন।
১. সরকারি আইন
নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ করার জন্য যেসব আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয় তাকে সরকারি আইন বলে। সরকারি আইন আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত যথা-
- ক. ফৌজদারি আইন: রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের কাহ পরিচালনার জন্য ফৌজদারি আইন প্রণয়ন করা হয়। মূলত কোন কারণে ব্যক্তির অধিকার ক্ষুন্ন হলে এ-আইনের মাধ্যমে অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- খ. প্রশাসনিক আইন: রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের যাবতীয় কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য এ-আইন প্রণয়ন করা হয়। মূলত প্রশাসনিক কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণের জন্য এ-ধরণের আইন তৈরি করা হয়।
- গ. সাংবিধানিক আইন: এ-ধরণের আইন সংবিধান দ্বারা প্রণয়ন হয়। সংবিধানে যেসব বিধিবিধান রয়েছে সেসব বিধিবিধান বা আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।
২. বেসরকারি আইন
ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক রক্ষার জন্য যেসব আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয় তাকে বেসরকারি আইন বলে। এ-ধরণের আইনের দ্বারা বিভিন্ন চুক্তি ও দলিল সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করা হয়। মূলত, সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখতে বেসরকারি আইন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
৩. আন্তর্জাতিক আইন
রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক রক্ষার জন্য যেসব আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয় তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলে। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে কেমন আচরণ করবে, এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকের সাথে কেমন ব্যবহার করবে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান কি হবে তা আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।